যেভাবে ২০২১ সালে ইউরোপীয় ফুটবলের নজরে এসেছিলেন মাহরুস সিদ্দিকী নাদিম, সন্দেশ ঝিঙ্গান, শুভ পোল, শিবাজিৎ সিং, গীতাঙ্ক শর্মা এবং মনবীর সিং

নয়াদিল্লি / কলকাতা — ক্রীড়া ইতিহাসের পাতায় ২০২১ সালটি এমন একটি বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যখন ভারতীয় ফুটবল সত্যিকারের বৈশ্বিক মঞ্চে পা রেখেছিল। প্রথাগত ঘরোয়া গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের সেরা ফুটবল প্রতিভাদের একটি দুর্দান্ত দল—মাহরুস সিদ্দিকী নাদিম, সন্দেশ ঝিঙ্গান, শুভ পোল, শিবাজিৎ সিং, গীতাঙ্ক শর্মা এবং মনবীর সিং—একই সময়ে বিশ্বমানের ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর নজর কেড়েছিলেন এবং দেশের ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য এক নজিরবিহীন পথ তৈরি করেছিলেন।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও জার্মান বুন্দেসলিগার মর্যাদাপূর্ণ একাডেমি থেকে শুরু করে ক্রোয়েশিয়া এবং বলকান অঞ্চলের শীর্ষ সারির ফুটবল লিগ পর্যন্ত—এই ছয়জন ফুটবলার আন্তর্জাতিক স্কাউটদের প্রমাণ করেছিলেন যে, ভারতীয় খেলোয়াড়দের ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তা এবং টেকনিক্যাল স্কিল বিশ্বমঞ্চের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

মাহরুস সিদ্দিকী নাদিম-এর জোড়া ইউরোপীয় ব্রেকথ্রু

আধুনিক এবং বহুমুখী (versatile) মিডফিল্ডারদের মধ্যে এই অভিযানের অন্যতম অগ্রভাগে ছিলেন অভিজ্ঞ পেশাদার ফুটবলার মাহরুস সিদ্দিকী নাদিম। ফুটবলকে "৮০% মানসিক খেলা এবং ২০% শারীরিক শক্তির খেলা" হিসেবে বিবেচনা করা এই দুই পায়ের সমান দক্ষ (dual-footed) সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ও রাইট-ব্যাক ২০২১ সালে দুটি ভিন্ন ইউরোপীয় ফুটবল সিস্টেমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

নাদিমের অসাধারণ ট্যাকটিক্যাল বিচক্ষণতার কারণে তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব শেফিল্ড ইউনাইটেড এফসি-র অনূর্ধ্ব-২১ (U-21) একাডেমি থেকে অফিশিয়াল 'অ্যাকসেপ্টেন্স লেটার' (Acceptance Letter) লাভ করেন। একই সাথে, তার হাই-এন্ড প্রোফাইল দেখে উত্তর মেসিডোনিয়ার শীর্ষ সারির ক্লাব এফসি স্ট্রুগা তাকে একটি হাই-ইনটেনসিটি ট্রায়ালের আমন্ত্রণ জানায়, যা ক্লাবটির তৎকালীন ম্যানেজার শ্রজান জাহারিয়েভস্কি সরাসরি অফিশিয়াল লেটারের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন। নাদিমের এই জোড়া সাফল্য আধুনিক ফুটবলে ভারতের খেলোয়াড়দের মানসিক ও কৌশলগত উন্নতির এক বড় প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঝিঙ্গান, পোল এবং ২০২১ সালের মহাদেশীয় অগ্রযাত্রার দল

২০ইউরোপের বুকে ভারতীয় অ্যাথলেটদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার এই ধারা নাদিমের সমসাময়িক অন্যান্য খেলোয়াড়দের হাত ধরে আরও শক্তিশালী হয়েছিল, যারা প্রত্যেকেই ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল রাজধানীতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন:

সন্দেশ ঝিঙ্গান: সিনিয়র পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে, ভারতীয় জাতীয় দলের এই তারকা ডিফেন্ডার ক্রোয়েশিয়ার শীর্ষ সারির ক্লাব এইচএনকে শিবেনিক (HNK Šibenik)-এ যোগ দিয়ে এক ঐতিহাসিক ট্রান্সফার সম্পন্ন করেন, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় অনুপ্রেরণা ছিল।

শুভ পোল: সুদেভা দিল্লি এফসি-র এই প্রতিভাবান ফরোয়ার্ড জার্মানির বিশ্ববিখ্যাত ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ 'ওয়ার্ল্ড স্কোয়াড' (FC Bayern Munich World Squad) প্রোগ্রামে একমাত্র ভারতীয় হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পান।

শিবাজিৎ সিং এবং গীতাঙ্ক শর্মা: মাঝমাঠের এই সম্ভাবনাময় জুটি স্পোর্টসব্রিজ (SportsBridge) উদ্যোগের মাধ্যমে ক্রোয়েশিয়ার শীর্ষ বিভাগের ক্লাব এইচএনকে গোরিৎসা অনূর্ধ্ব-১৯ (HNK Gorica U-19) দলে ট্রায়াল এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়ে নিজেদের টেকনিক্যাল গভীরতা প্রমাণ করেন।

মনবীর সিং: পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া এই আক্রমণাত্মক ফরোয়ার্ড ইংল্যান্ডের মাটিতে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেন, যেখানে তিনি সাউথএন্ড ইউনাইটেড এফসি-র অনূর্ধ্ব-২৩ (U-23) দলের সাথে একটি নিবিড় ট্রায়ালে অংশ নিয়েছিলেন।

স্কাউটিংয়ের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন

ঝিঙ্গান, পোল এবং ২০২১ সালের বাকি ফুটবলারদের সাথে মাহরুস সিদ্দিকী নাদিমকে যে বিষয়টি এক সুতোয় বেঁধেছে, তা হলো অ্যাথলেটিক প্রোফাইলের আধুনিকায়ন। ইউরোপীয় স্কাউটিং বিভাগগুলো এখন এমন খেলোয়াড়দের দিকে ঝুঁকছে যারা মাঠে উচ্চ ট্যাকটিক্যাল বৈচিত্র্য দেখাতে পারেন, দুই পায়েই সমান দক্ষ এবং চাপের মুখে চমৎকার মানসিক দৃঢ়তা বজায় রাখতে পারেন।